পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে...
বৃহস্পতিবার, জুন ১৩, ২০২৪

যেভাবে রাফা বাংলাদেশ থেকে টেসলায়

ছয় দফা নিউজ ডেস্ক: ২০০১ সাল। গুটি গুটি পায়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে রাফিয়া রহমান রাফা হাজির হলেন ভিকারুননিসা নূন স্কুলে। দুচোখ ভরা স্বপ্ন এবং ভালো ফলাফলের প্রত্যয় নিয়ে এখানেই কাটিয়ে দিলেন স্কুল এবং কলেজ জীবন। অতঃপর ভিকারুননিসার গণ্ডি পেরিয়ে ২০১৪ সালে পা রাখেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। ভর্তি হন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগে। ভিকারুননিসা থেকে বুয়েট! রাফার স্বপ্নের গল্প হয়তো এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু কে জানত রাফা একদিন টেসলায় পা রাখবেন — নিযুক্ত হবেন টেসলার গ্লোবাল সাপ্লাই অ্যানালিস্ট হিসেবে!
২০২৩ সালের শুরুতে রাফা টেসলার গ্লোবাল সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট বিভাগে শুরু করেন ইন্টার্নশিপ। তারপর পদোন্নতি পেয়ে কাজ শুরু করেন একই বিভাগে গ্লোবাল সাপ্লাই অ্যানালিস্ট হিসেবে। রাফার টেসলায় পথচলা শুরু থেকেই সহজ কোনো ব্যাপার ছিলো না। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অর্জন করেছেন এই জায়গা। টেসলা যাত্রার পুরো গল্প রাফা শোনালেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে।
বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন রাফার ছোটবেলা থেকেই ছিল। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। পছন্দের বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর দেখতে শুরু করেন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। বুয়েট থেকে পাশ করে বেরিয়ে আড়াইবছর চাকরিও করেছিলেন। চাকরির পাশাপাশি চলছিলো উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি। সেই স্বপ্ন পূরণ হলো ২০২২ সালে। দ্য ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অ্যারলিংটনে স্প্রিং-২০২২ সেশনে সুযোগ পান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার।
স্নাতকোত্তর করার পাশাপাশি রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও কাজ করেছিলেন রাফা। তারপর ইন্টার্ন হিসেবে যুক্ত হন টেসলা ইনকর্পোরেটেডের সাথে। টেসলা ইনকর্পোরেটেড মূলত আমেরিকার বৈদ্যুতিক যান এবং ক্লিন এনার্জিভিত্তিক পণ্য নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি টেসলা মোটরস নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
রাফার টেসলাযাত্রা
‘বাইরে আসার টার্গেট শুরুর থেকেই ছিল। কিন্তু বুয়েট থেকেই বের হয়েই বাইরে চলে আসা কষ্টকর ছিল। তখন একটু দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম। কারণ পরিবার ছেড়ে বাইরে চলে আসা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। কিছুটা সময় নিয়েছিলাম। এজন্য দেশে কিছুদিন চাকরি করেছি,’ বলেন রাফা।
অবশেষে ২০২১ সালে সব দ্বিধা কাটিয়ে পড়াশোনার জন্য রাফা বিদেশ যাত্রার বিষয়ে মনস্থির করেন। এবার তিনি একা নন। সঙ্গী হন তার স্বামী। দেশে থাকাকালীন দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাই দেশের বাইরে এসে স্নাতকোত্তর করার লক্ষ্য দুজনেরই ছিল। সেভাবেই দুজন টেক্সাসে আসেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন।
রাফা বলেন, ‘আমার হাজবেন্ড ২০২২ সালে টেসলাতে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েছিল। টেসলার অফিস ছিল ক্যালিফোর্নিয়াতে। তো কাজের সুবাদে সে ক্যালিফোর্নিয়াতে চলে আসে। আমি ছিলাম টেক্সাসে। আমাদের পরিকল্পনা ছিল কীভাবে একই স্টেটে থাকা যায়। সত্যি কথা বলতে আমি যখন ইন্টার্নশিপের আবেদন শুরু করি, তখন আর অন্য কোথাও আবেদন করিনি। টেসলাতেই ১৫-২০টির মতো পদে আবেদন করেছি। কারণ আমার টার্গেট ছিল, যেভাবেই হোক ক্যালিফোর্নিয়াতে আসা লাগবেই।’
রাফার অদম্য চেষ্টাই হয়তো তাকে টেসলায় প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। তৌফিক ইন্টার্নশিপ পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই রাফাও সুযোগ পান টেসলায় গ্লোবাল সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ইন্টার্নশিপ করার। চলতি বছরের মে মাসে ইন্টার্নশিপ শেষে রাফার স্বামীও টেসলাতেই পূর্ণকালীন কর্মী হিসেবে নিযুক্ত হন।
‘ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই, যারা তাদের স্বপ্নকে বিশ্বাস করে’ — ইলানর রুজভেল্টের এই উক্তিটির মতোই শুরু থেকেই রাফার নিজের স্বপ্নের উপর বিশ্বাস ছিল। ‘এখানে আমি কোনো মিডিয়োকোর চাকরি করতে চাইনি। আমার লক্ষ্য বরাবরই বড় ছিল,’ বলেন রাফা।
টেসলায় কাজের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টিকে অনেকেই কম গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টির গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশে চাকরির ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে বিভিন্ন গার্মেন্টস এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া বেশ দুষ্কর। রাফার মতে, আইপিইতে বাংলাদেশে যারা পড়াশোনা করেন, তাদের উচিত শুধু গার্মেন্টস খাতকে লক্ষ্য না করে অন্য সব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানেও চাকরির চেষ্টা করা।
দেশে থাকার সময় রাফার গার্মেন্টেস সেক্টরে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। রাফা টেসলা ইনকর্পোরেটেডে ইন্টার্নশিপ শুরু করেছিলেন গাড়ির সিটিং টিমে। গাড়ির সিটের যে কভার থাকে তার কাটিং পদ্ধতি অনেকটা গার্মেন্টেসের মতোই। পূর্ব অভিজ্ঞতাই এক্ষেত্রে তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সিটিং টিমে কাজ করে সফল হওয়ার পর রাফা যুক্ত হন গাড়ির এক্সটেরিয়র টিমে। বর্তমানে সেখানেই কাজ করছেন।
‘দেশে থাকাকালীন সবাই ভেবেছে আমি যেহেতু গার্মেন্টস সেক্টরে কাজে ঢুকেছি, তাই সেখান থেকে বের হতে পারব না। কিন্তু সেটা সত্যি নয়। একটা অভিজ্ঞতাকে মানুষ নানাভাবে কাজে লাগাতে পারে, যদি সে চায়। তাই নিজেকে ছোট জায়গায় সীমাবদ্ধ না করে বড় পরিধিতে চিন্তা করা উচিত,’ বলেন রাফা।
দেশে চাকরিকালীন যা শিখেছিলেন, তার থেকে টেসলায় ইন্টার্নশিপ করে আরো অনেককিছু শিখেছেন বলে মনে করেন রাফা। তাদের কাজের ক্ষেত্র উল্লেখ করে বলেন, ‘টেসলায় অনেক দ্রুততার সাথে কাজ করা হয়। এখানে কাজ করতে গেলে সবসময় সজাগ থাকতে হয়। সিদ্ধান্তও নিতে হয় দ্রুত।’
প্রস্তুতি শুরু হোক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই
রাফার মতে, বাইরে পড়তে আসা এবং কাজের সুযোগ তৈরির প্রচেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই শুরু করা উচিত। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন জিআরই, টওফেল পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। গবেষণার প্রতিও প্রাধান্য দেন তিনি।
তাছাড়া, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার প্রতিও জোর দেন রাফা। পড়াশোনা চলাকালীন বা শেষে যত বেশি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করা হবে, তত বেশি কাজের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেন। রাফা নিজেও সেটাই করেছিলেন। টেসলাতেই প্রায় ১৫-২০টির মতো পদে আবেদন করেছিলেন তিনি। তাছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও আবেদন বহাল রেখেছিলেন। অধিক আবেদনের ফলেই দ্রুত কাজের সুযোগ তার কাছে এসেছে।
রাফা বলেন, ‘একবার বাইরে পড়তে চলে আসলে ইন্টার্নশিপ পাওয়া কঠিন হতে পারে, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ক্যারিয়ার ফেয়ার হয়। সেখানে অনেকেই হয়তো যায়, আবার অনেকে সিরিয়াসলি নেয় না। অনেকেই হয়তো ভাবে, এত মানুষের মধ্যে আমি কিছুই করতে পারবো না। এটা আসলে সত্যি নয়। কাজ নির্ভর করে আত্মবিশ্বাসের উপর।’
এখন রাফার স্বপ্ন টেসলাতে থেকে সেরা কর্মীর খেতাব জেতা। তিনি বলেন, ‘এখন কয়েক বছর এখানেই এক্সপ্লোর করতে চাই। পরে সিদ্ধান্ত নেব কোথায় কী করা যায়।’

তথ্যসূত্রঃটিবিএস

আরো পড়ুন

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

বিশেষ সংবাদ