পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে...
বৃহস্পতিবার, জুন ১৩, ২০২৪

ঢাকায় দুশ্চিন্তায় ফিলিস্তিনের শিক্ষার্থীরা

ছয় দফা নিউজ ডেস্ক:

ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী ইব্রাহিম এস কিশকো। পড়ালেখার জন্য থাকেন ঢাকায়। গত মাসে গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর পর বেশ কয়েক দিন চেষ্টা করেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হন তিনি। পরবর্তীতে যদিও তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন, কিন্তু গাজায় ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তার পরিবার কীভাবে দিন পার করছে তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন এই শিক্ষার্থীর।
ইব্রাহিম বলছিলেন, তার মাতৃভূমিতে কী ঘটছে– সেটি জানার একমাত্র উপায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সম্প্রতি ফেসবুকে তিনি গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতার একটি পোস্ট দেখেন। জায়গাটি তার কাছে পরিচিত মনে হওয়ায় তিনি পোস্ট করা ব্যক্তির কাছে এ সম্পর্কে জানতে চান। ওই ব্যক্তি ইব্রাহিমকে জানায় যে ঘটনাটি ‘কিশকো গণহত্যার’।
এ কথা শুনে চমকে ওঠেন ইব্রাহিম। কারণ তিনি নিজেও কিশকো বংশের অন্তর্গত। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত। ২০২১ সালে গাজা থেকে পড়ালেখার উদ্দেশে ঢাকায় এসেছেন।
মাতৃভূমি থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ঢাকায় ইব্রাহিমের মতো আরো কয়েকজন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী রয়েছেন। গাজার এ সংকটময় পরিস্থিতিতে তাদের সবার হৃদয় ভারাক্রান্ত। যন্ত্রণায় কাটছে তাদের দিন-রাত।
পাঠ্যপুস্তক, ক্লাস-পরীক্ষা কিংবা শিক্ষকদের লেকচার এসবের কোনো কিছুতেই তাদের মন নেই। তাদের চিন্তাজুড়ে কেবল বাবা-মা, ভাই-বোনসহ সেসব প্রিয়জনেরই ভাবনা, যারা তাদের হাসি-খুশির কারণ। এই প্রিয়জনরা আদৌ বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন– কেবল এ কথাই উঁকি দিচ্ছে তাদের মনে।
ফিলিস্তিনি এসব শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানেন না, যে ঘরবাড়িতে তারা দুরন্তপনা করে কৈশোর কাটিয়েছেন, নিজভূমে ফিরে তারা সেই ঘরবাড়ি, উঠান আর কখনও দেখতে পাবেন কি না। হাজার মাইল দূরে অবস্থান করলেও তাদের মন পড়ে রয়েছে মাতৃভূমিতে, যেখানে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে দখলদার ইসরায়েল।
সম্প্রতি ঢাকায় অবস্থানরত অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরের দুই ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী এসব কথা তুলে ধরেন।
ইসরায়েলি অবরোধ আর বোমার নিচে অসহায় জীবন:
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফজলে রাব্বি হলের একটি কক্ষে থাকেন ইব্রাহিম। সেখানে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, গত ২৯ অক্টোবর ইসরায়েলের ধারাবাহিক বোমা হামলায় কিশকো বংশের ৭৫ জন নিহত হন। ধ্বংস হয় তাদের ঘরবাড়িও। তিনি বলেন, “দুই দিন আগে এ বোমা হামলা হয়। নেটওয়ার্ক জটিলতার কারণে গত রাতে (৩১ অক্টোবর) আমি এ খবর পাই। আমি তখনো আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমি হাসপাতালে থাকা একজনের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে জানিয়েছেন সেখানে কী ঘটেছে।” তিনি আরও বলেন, “সৌভাগ্যবশত আমার বাবা-মা ও ভাই সেখান থেকে সরে যেতে পেরেছেন। তবে আমার চাচারা ও তাদের পরিবার, দাদা-দাদিসহ ৭৫ জন নিকটাত্মীয় নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন।”
উত্তর গাজা, গাজা সিটি, খান ইউনিস ও রাফাহ সিটি নিয়ে গঠিত গাজা উপত্যকা। ইব্রাহিমের পরিবার গাজা সিটিতে বসবাস করত। ইসরায়েলি বোমা হামলার কারণে তারা খান ইউনিসে আশ্রয় নিয়েছেন।
ইব্রাহিম পরিবারের সঙ্গে যে বাড়িতে বেড়ে উঠেছেন, যে বাড়িতে তার কিশোরকাল কেটেছে, সেটি এখন পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। তিনি বলেন, এখানে তিনবার বোমা হামলা হয়েছে। সকাল পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছিল। এটি বেশ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ছিল। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আরও বহু মানুষ চাপা পড়েছে। তাই মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে।
এত সব অনিশ্চয়তার মধ্যে গত বুধবার (১ নভেম্বর) পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন ইব্রাহিম। কিন্তু নেটওয়ার্কের কারণে তাদের যোগাযোগ বার বার বিঘ্নিত হচ্ছিল। তাদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে বেশ সময় লাগছিল। তার পরিবার পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎসহ নানান সংকটে কীভাবে দিনাতিপাত করছে, সেসব খবরা-খবর ইব্রাহিমকে জানিয়েছে তার পরিবার।
ইব্রাহিম তার কথায় গাজার ভয়াবহ মানবিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে না গাজাবাসী। বিভিন্ন দেশ সহযোগিতা করতে চাইলেও ইসরায়েল অনুমতি না দেওয়ায় গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। সেখানে রুটি ও পানির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে ইসরায়েল। অবস্থা এমন যে গাজার লোকেরা মৌলিক প্রয়োজনটুকু মেটাতেও ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
ইব্রাহিমের ভাই মুহাম্মাদ এস কিশকো (২৭) একদিন সকালে কিছু রুটির জন্য বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পরেও তিনি ফিরে আসেননি। মুহাম্মাদ একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।
ইব্রাহিমের পরিবার খান ইউনিসে একটি জনাকীর্ণ জায়গায় অবস্থান করছে। সেখানকার কিছু কিছু কক্ষে যেখানে ছয়জন মানুষের পক্ষে স্বস্তির সঙ্গে ঘুমানো কঠিন, সেখানে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
ইব্রাহিম বলেন, যা ঘটছে তা আক্ষরিক অর্থে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা। পুরো বিশ্বের নীরবতার কারণে হামলাকারীরাও প্রকারান্তে উৎসাহিত হচ্ছে। তারা (ইসরায়েল) ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে। বিদ্যুৎ নেই। হাসপাতালগুলো জ্বালানির অভাবে ভুগছে। সেখানে পরিস্থিতি সত্যিই কঠিন।

গাজা আমাদের কাছে ভালবাসার সমুদ্র:
ইব্রাহিম জানান, বাংলাদেশে প্রায় একশ ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের বেশিরভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস (ব্যাচেলর অব মেডিসিন, ব্যাচেলর অব সার্জারি) ও বিডিএস (ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি) কোর্সে অধ্যয়নরত। অন্য দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে আরও কিছু শিক্ষার্থী।
২০ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের কাছে গাজা একটি ভালবাসার সমুদ্র। তাই আমরা ইসরায়েলিদের কাছে অবরুদ্ধ হতে চাই না। গাজার সবাই বাঁচতে চায়। কিন্তু সেখানকার পরিস্থিতি আমাদের পুরোপুরি ও শান্তিপূর্ণভাবে বাঁচতে দিচ্ছে না। আমার জীবনে গত দুই দশকের মধ্যে চারটি যুদ্ধ দেখেছি।”
তিনি আরও বলেন, “ইসরায়েলের অনুমতি ছাড়া ফিলিস্তিনিরা নড়তেও পারে না, কিছু করতে পারে না। ফিলিস্তিনিরা চায় ইসরায়েলের দখলদারিত্ব শেষ হোক। ফিলিস্তিন স্বাধীন হোক। আমরা যা চাই তা হলো মৌলিক মানবাধিকার।”
ইব্রাহিমের মতো ফিলিস্তিনের আরেক শিক্ষার্থী ইসাক এন নামৌরা। তিনি রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি পশ্চিম তীরের বাসিন্দা। যদিও এখন হামলা কেবল গাজায় হচ্ছে, তারপরেও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা খুব বেশি নিরাপদে নেই।
রাজধানীর গুলশানের একটি ক্যাফেতে বন্ধুদের সঙ্গে গ্রুপ স্টাডিতে ব্যস্ত ছিলেন ইসাক। কঠিন এই মুহূর্তে ইসাকের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বন্ধুরা তাকে সহায়তা করছিল। যখন ইসাকের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়, তখন তাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। ইসাক বলেন, “আমি আমার পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু কীভাবে আমি পড়ালেখায় মনযোগ দেব, যখন আমাদের নাগরিকরা কষ্টে আছে?”
ইসাক বাংলাদেশে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি। তার কাছে ঢাকা আর ফিলিস্তিনের জীবনে বিশাল এক তফাৎ বিদ্যমান। তিনি বলেন, “ঢাকায় আমি কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই ইচ্ছামতো ভ্রমণ করতে পারছি। এখানে আমার নিরাপত্তা আছে। আমি চাইলে পানি পাচ্ছি, বিদ্যুৎ পাচ্ছি। ভ্রমণের সময় আমি যে মানসিক প্রশান্তি উপভোগ করি, তা ফিলিস্তিনের তুলনায় এখানে উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো।”
বাংলাদেশে ফিলিস্তিন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি জিয়াদ হামাদ বলেন, “বাংলাদেশে আমাদের গাজার ৭০ জনেরও বেশি এবং পশ্চিম তীরের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী রয়েছে। আমরা সর্বাত্মকভাবে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।”
ইসরায়েলি বর্ণবাদ শাসনের অধীনে জীবন: ইসাক আশঙ্কা করছেন, ফিলিস্তিনিদের এখন গাজা থেকে জাতিগতভাবে নির্মূল করা হচ্ছে। ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের দীর্ঘ ইতিহাস ১৯৪৮ সাল এবং তার আগে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, যুদ্ধাপরাধ এবং একটি নৃশংস বর্ণবাদী শাসনের সঙ্গে জড়িত। তাই জাতিগত নির্মূল নিয়ে ইসাকের এই ভয়; গাজায় হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এই ভয় আরও প্রকট হয়েছে। গাজার পর অবশিষ্ট থাকবে পশ্চিম তীর। এই পশ্চিম তীরও এখন নিরাপদ নয়। এটি কখনো নিরাপদ ছিলও না।
ইসাকের পরিবারও ইসরায়েলি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার এক শ্যালক ১৪ বছর ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এক শীতের রাতে বাড়ি থেকে ইসাকের এক ভাইকেও তুলে নিয়ে গিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। এমনকি, অস্ত্র তল্লাশির নাম করে তার ভাইকে বিবস্ত্র পর্যন্ত করেছিল তারা। ইসাক জানায়, “ইসরায়েলের মানসিক নির্যাতনে মাত্রা চরম। আমার চোখের সামনে আমার ভাইকে বিবস্ত্র করা হয়েছিল।” তিনি বলেন, “যদি আমার সন্তানদের সামনে আমার সঙ্গে এমন হতো, তাহলে এর মতো লজ্জার চেয়ে মৃত্যুই আমার কাছে ভালো মনে হতো।” পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা আশে-পাশের গ্রামগুলোতে যেতেও ইসরায়েলি বাধার সম্মুখীন হয়। বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি কেন্দ্র তৈরি করে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
তাছাড়া, প্রতিদিনই ইসরায়েলি বাহিনীর ভূমি দখলের মতো ঘটনা ঘটছেই। সম্প্রতি ইসাকের এক চাচার ঘরবাড়ি দখল করে নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। এখন তার চাচা পরিবার নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটাচ্ছেন।

তথ্যসূত্রঃটিবিএস

আরো পড়ুন

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বশেষ সংবাদসমূহ

বিশেষ সংবাদ